
প্রতিবেদন- গৌরীশঙ্কর মহাপাত্রঃআজ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু দিবস।১৯৩০এর ২৩শে মে আজকের দিনে মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের আবিষ্কর্তা প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু।
১৮৫০এর ১২ই এপ্রিল মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের কালিমাটিতে তাঁর জন্ম। বাবা মতিলাল ছিলেন বহরমপুর কোর্টের সফল আইনজীবী। রাখালদাস ছিলেন মতিলালের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী কালিমতির ৮ সন্তানের একমাত্র জীবিত সন্তান। ফলে প্রাচুর্য ও আদরের আধিপত্য দুটোই ছিল তাকে ঘিরে।আর ডি ব্যানার্জী নামে অধিক পরিচিত ছিলেন তিনি।
এন্ট্রান্স পাশের আগেই রাখালের বিয়ে হয় উত্তর পাড়ার জমিদার নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের কন্যা বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখিকা কাঞ্চনমালা দেবী’র সঙ্গে। তবে এর জন্য তার পড়াশুনো বিঘ্নিত হয়নি। কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুল থেকেএন্ট্রান্স পাস করে রাখালদাস উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন কলকাতায়।১৯০৩এ প্রেসিডেন্সি থেকে এফ এ পাস এবং ঐ বৎসর বাবার মৃত্যু পরবর্তী পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে গন্ডগোলের জেরে পঠন-পাঠনে সাময়িক বিরতি। পরে ১৯০৭এ প্রেসিডেন্সি থেকে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে বি এ, ১৯১১তে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম এ পাশ। এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে ১৯০৬-১৯০৮ তাঁর প্রকাশিত লেখা সকলের নজর কাড়ে। প্রাচীন লেখ ও মুদ্রার ব্যাপারে তিনি যে জহুরী তা বুঝে গেছিলেন অনেকেই।এমএ পাশের পরের বৎসর ১৯০৭এ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের ডিরেক্টর জেনারেলের পদে নিয়োগ। স্যার জন মার্শাল রাখালদাসকে ভারতীয় যাদুঘরের আর্কিওলজিক্যাল বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত করেন।
১৯১১ ওয়েস্টার্ণ সার্কেলের সুপারিনটেনডেন্ট হয়ে পুনেতে বদলি ও পুরাতাত্ত্বিক সর্বক্ষনের কর্মী। ১৯০৭-১৯১৩ ছয় বৎসর বোম্বাই প্রেসিডেন্সির বিভিন্ন যায়গায় তার নেত়ত্বে প্রত্নতাত্বিক অভিযান এবং এই সময়ে সিন্ধু সভ্যতার আবিস্কার। ১৯২২ এ তিনি হরপ্পা সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র মহেঞ্জোদাড়ো পুন আবিস্কার করেন। ১৯২৬ এ আর্কিও লজিস্ট বিভাগ থেকে বরখাস্ত।১৯২৮এ বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে “মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী’ চেয়ারের অধ্যাপক নিযুক্ত হন।
তিনি মহেঞ্জোদাড়োর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার ছাড়াও পাহাড়পুরে খননকার্যের পরিচালক ছিলেন।’কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক’, পাল রাজবংশ’দের সম্পর্কে তিনি মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করেন। মুদ্রা সম্বন্ধীয় বিষয় বাংলাতে প্রথম গ্রন্থ রচনার কৃতিত্ব দেখান। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘প্রাচীন মুদ্রা’, ঐতিহাসিক ও সামাজিক উপন্যাস’ :বাংলার ইতিহাস’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড), ‘পাষাণের কথা’, ‘শশাঙ্ক’, ‘ধর্মপাল’ ‘উড়িষ্যার ইতিহাস’, ‘ত্রিপুরী হৈহয় জাতির ইতিহাস’, ‘করুণা’, বাংলার ভাস্কর্য’,’দি অরিজিন অফ বেঙ্গল স্ক্রিপ্ট’, ইত্যাদি সুখপাঠ্য। তার ঐতিহাসিক উপন্যাস গুলি আজও পাঠক সমাদৃত। কিন্তু গবেষণার প্রয়োজন ছাড়া এসব উল্টে দেখার সময় কৈ বাঙ্গালীদের’? ইতিহাস অধ্যাপিকা তপতী গুহ ঠাকুরতার মতে -“বৈজ্ঞানিক ইতিহাস লেখার পুরো উদ্যোগ রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের।”
জীবনের শেষে দিকে তিনি ইংরেজ রাজত্বে রাজনৈতিক শিকার হয়েছিলেন বলে অনেকের অভিমত।প্রত্নতত্ত্ববিদ বন্দোপাধ্যায়ের ভাগ্যে জুটেছে চোরের অপবাদও ,পদে পদে অপমানিত ও অপদস্থ হয়েছেন ।আর্কিওলজিক্যাল বিভাগে সামান্য একজন সহকারি কর্মীর এমন হুহু পদ্যোন্নতিতে ঈর্ষান্বিতের সংখ্যা কম ছিল না প্রিয়জন মহলে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের ডিরেক্টর জেনারেল জন স্যার মার্শালের কাছে ও ভালো ব্যবহার পান নি তিনি। যদিও তারই হাত ধরে শ্রী বন্দোপাধ্যায়ের এই পদ্যোন্নতি বলে ঐতিহাসিকদের অভিমত।জন মার্শাল রাখালদাস ব্যানার্জি ফরগেট আর্কিওলজিস্ট পোস্টে লিখেছেন ১৯২৪ সালের আগে মার্শাল মহেঞ্জোদাড়োর কথা সে ভাবে জানতেন না।দেশের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু তার ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’, বইতে মহেঞ্জোদাড়োর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের কৃতিত্ব পুরোটাই দিয়েছেন জন মার্শালকে, তাতে নাম নেই রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়ের। আরও কষ্ট কর যে,নিজের দুরন্ত সব কৃতিত্বে ঈর্ষান্বিত অফিস রাজনীতির শিকার হয়ে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত হতে হয় তাকে যা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য ও। তিনি নাকি মূর্তি চুরি করেছেন এমন মিথ্যা অভিযোগে রাখালদাসকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়১৯২৬এ । সে সময় ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে উড়িষ্যার হীরাপুরের ৬৪ যোগিনী মন্দিরের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চলছিল। দায়িত্বে ছিলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। সেই সময় সেখান থেকে মূল্যবান একটি মূর্তি চুরি যায়, তার প্রিয় মার্শাল সাহেব যিনি বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতিতে সাহায্য করেছিলেন তিনি রাখালদাস এর আবিষ্কারে কৃতিত্বের ভাগ বসানোর নোংরা রাজনীতির খেলায় মাতলেন। কোন প্রমাণ ছাড়াই দোষী সাব্যস্ত করলেন রাখালদাসকে। বরখাস্ত হলেন চাকরি থেকে।
এসবের পর মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। একে কর্মচ্যূত পয়সার অভাবে জর্জরিত অন্য দিকে পুত্রের অকাল মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়েন তিনি। ৪৫ বছর বয়সে১৯৩০ বিখ্যাত বাঙ্গালী প্রত্নতত্ত্ববিদের
প্রয়ান।
