।।। প্রতিবেদক: গৌরীশংকর মহাপাত্র।।।বাংলা সাহিত্যের কথাসাহিত্যিক, ঔপনাসিক ও গল্পলেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৮ সালের ২৩শে জুলাই বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে। পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মা প্রভাবতী দেবী। তারাশঙ্করের বড় হওয়ার পেছনে তার মায়ের দান অবিস্মরণীয়। লাভপুর যাদবলাল হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি হন পরে সাউথ সুভার্ণ কলেজে এখনকার যার নাম আশুতোষ কলেজে ভর্তি হন।                                     কংগ্রেস কর্মী হিসেবে সমাজসেবামূলক কাজে যোগদান, পরে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৩০এ তিনি জেল খাটেন।একবার ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য আসেন এবং তারপরেই নিজেকে উৎসর্গ করেন সাহিত্য সাধনায়।১৯৩২এ তাঁর প্রথম উপন্যাস “চৈতালি ঘূর্ণি”। ১৯৪০এ তাঁর কলকাতা আসা এবং ১৯৪১এ তিনি বরানগর চলে যান।১৯৪২এ বীরভূম জেলা সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংগঠনের সভাপতি হন। ১৯৫২তে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য হন।১৯৭০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন।জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম হওয়ায় বহু জমিদারদের কাছারি ঘুরে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন জমিদারদের মিথ্যা দেনার খাতে বিশেষত অন্তজ শ্রেণীর নারী ও পুরুষের উপর অত্যাচার। লাভপুরে এবং পাশাপাশি আমেদপুর, দুবরাজপুর,কীর্ণহার অঞ্চলে বেদে, সাঁওতাল, জেলে, ব্রাহ্মণ প্রভৃতি সব শ্রেণীর মানুষের জীবনধারা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। অপমানিতের মর্মবেদনা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। তিনি মনে করতেন মানুষের প্রবৃত্তি তার অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারাশঙ্কর সাম্যবাদের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন,শেষ পর্যায়ে তিনি অমৃতে আস্থা রাখেন।                           বিরল প্রতিভা সম্পন্ন লেখক অজস্র ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। বিংশ শতাব্দীর এই বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক ‘ডাকহরকরা,’ ‘বেদেনী’, ‘অগ্রদানী’, ‘কালাপাহাড়’, ‘ছলনাময়ী’, ‘রসকলি’, ‘নারী ও নাগিনী’, ‘তাসের ঘর’, ‘খাজাঞ্চি বাবু’, ‘পন্ডিত মশাই’, ‘ডাইনীর বাঁশির মত ৫৩টি ছোট গল্প বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। গল্পগুলি ভাবেও আঙ্গিকে চাতুর্যে তুলনাহীন। তার লেখা ‘গণদেবতা’,’ হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘দুই পুরুষ’, ‘কালিন্দী’, ‘পঞ্চগ্ৰাম’, ‘কবি’, ‘ধাত্রী’, ‘সন্দীপন পাঠশালা’, ‘বিচারক’, ‘সপ্তপদী’, ‘চৈতালি’ ‘ঘূর্ণি’, ‘পাপন পুরি’,’ নীলকন্ঠ’, আগুন প্রভৃতি প্রায় ৬৫টি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া বাংলা সাহিত‍্য ভান্ডারে তাঁর সৃষ্ট ১২টি নাটক,৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী,২টী ভ্রমণকাহিনী,১টি কাব্যগ্রন্থ, এবং ১টি প্রহসন আজও সাহিত্য রসিকদের কাছে কালজয়ী। ‘জলসাঘর’, ‘অভিযান’, ‘সপ্তপদী’, ‘বিচারক’, ‘বেদেনী’, ‘গণদেবতা’, ‘অগ্রদানী’, ‘রাইকমল প্রভৃতি বাংলা চলচ্চিত্র প্রেমীদের হৃদয়ে বিশেষ আসন করে নিয়েছে।                                              সাহিত্যকর্মে অবদানের জন্য বহু পুরস্কারে তিনি পুরষ্কৃত, পেয়েছেন রবীন্দ্র পুরস্কার, শরৎ পুরষ্কার, একাডেমি পুরস্কার, গণদেবতা উপন্যাসের  জন্য পেয়েছেন ‘জ্ঞানপীঠ’, পুরস্কার , ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’,এবং ‘পদ্মভূষণ’,সম্মানে সম্মানিত করেছেন। তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাসের নায়ক কবি সবাইকে ভালোবাসলেও ভালোবাসার সাধ তাঁর মেটেনি।                                                       কবিও গণদেবতার লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে আমরা নির্বাক। মনে হয়’ হায়- জীবন এত ছোট কেন? তারাশঙ্করের মৃত্যু ১৯৭১এর ১৪ ই সেপ্টেম্বর।

তথ্যসূত্র :- ১)প্রতিদিন জন্মদিন মৃত্যুদিন এবং : বীরকুমার শী।

২)ইউপিডিয়া

    Share

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *