।।প্রতিবেদন ।।

দেবলোকে মা সন্তোষীর আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট গনেশ পুত্র শুভ ও লাভের রাখি বন্ধন বঞ্চনা থেকে। গণেশের বোন একদিন গনেশের হাতে রাখি বেঁধে দেন। গণেশের দুই ছেলে শুভ লাভের  এতে হিংসে হয়।তারা বাবার কাছে বোনের বায়না ধরে। গণেশ দুই ছেলের সন্তোষ বিধানের লক্ষ্যে আগুন থেকে এক কন্যার জন্ম দেন, ছেলেদের সন্তোষের কারণে তার সৃষ্টি বলে গনেশ তার নাম রাখেন সন্তোষী। সন্তোষীকে পেয়ে হাতে রাখি পরিয়ে দেন ভাই শুভ ও লাভ।

    পুরাণে এক যুদ্ধক্ষেত্রে  শ্র্রীকৃৃষেের  কব্জিতে আঘাত লাগে, রক্তপাত দেখে পান্ডব জায়া দ্রৌপদী শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। আপ্লুত কৃষ্ণ অনাত্মীয়া দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং এর প্রতিদান দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন।একদা পাশা খেলায় জয়ী কৌরবরা দ্রৌপদীকে বস্ত্রহরণ করে অপমান করতে গেলে কৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্ভ্রম রক্ষা করে তার প্রতিদান দেন।।                       বিষুপ্রিয়া লক্ষ্মী স্বামীকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক সাধারণ মেয়ের ছদ্মবেশে  বলিরাজ এর কাছে আসেনা, বলিকে জানান তার নিরুদ্দেশ স্বামী যতদিন  না ফিরে আসেন ততদিন যেন বলিরাজা তাকে আশ্রয় দেন। শ্রাবণ পূর্ণিমা উৎসবে লক্ষ্মী বলিরাজের হাতে রাখি বাঁধতে গেলে বলিরাজ এর কারণ জানতে চান। লক্ষ্মী যথাযথ পরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বলেন। মুগ্ধ বলিরাজ বিষ্ণুকে বৈকুন্ঠে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। বলিরাজা সর্বস্ব ত্যাগ করেন। সেই থেকে শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিতে বোনেরা রাখি বন্ধন উৎসব পালন করেন। ইতিহাসে এমন ঘটনা ও বিরল নয়। খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৩২৬, মহামতি আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করেছেন। আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা রাজা পুরুর নিকট একটি পবিত্র সূত্র পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলেন আলেকজান্ডারের যাতে ক্ষতি না। রাজা পুরু রাখি কে সম্মান জানাতে যুদ্ধক্ষেত্রে আলেকজান্ডারকে ঘাত করেন নি।

    সময়টা ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দ। চিতোরের রানী  কর্ণাবতী খবর পেয়েছেন গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করতে আসছেন। বিধবা হিন্দু রাজপুত রানী কর্ণাবতী অসহায়তা জানিয়ে মোগল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে রাখি পাঠিয়ে তার সাহায্য প্রার্থনা করেন। রাখিতে আপ্লুত হুমায়ুন বাহাদুর শাহর গতি রুদ্ধ করে চিতোর রক্ষায় সৈন্য প্রেরণ করেন কিন্তু তার আগেই চিতোর অধিগ্রহণ করেন বাহাদুর শাহ। এ দিকে বাহাদুর শাহের হাত থেকে রক্ষা পেতে রানি ১৩০০০পুর স্ত্রীকে নিয়ে জহরব্রত পালন করে আগুনে আত্মাহুতি দেন। হুমায়ুন চিতোর পৌঁছে দেখেন চিতোর বাহাদুর শাহের দখলে। তিনি বাহাদুর শাহকে উৎখাত করে কর্ণাবতীর ছেলে বিক্রমজিৎকে সিংহাসনে বসিয়ে দেন। কর্ণাবতীর ইতিহাস ও পুরাণ যে শিক্ষা দিয়েছিল সেই শিক্ষা কে পাথেয় করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি বন্ধন উৎসব পালন করেন ১৯০৫এ। যখন তিনি বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ গড়ার জন্য কলকাতা, ঢাকা, সিলেট থেকে হাজার হাজার হিন্দু মুসলিম ভাই বোনকে আহ্বান করেছিলেন একতার প্রতীক হিসেবে রাখিবন্ধন উৎসব পালনে। আজ থেকে শতবর্ষ আগে হিন্দু মুসলমানের একতায় উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভীত নাড়িয়ে দিয়ে ছিল। ১৯০৫ এর জুন মাসে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়,ঐ সালের ১৬ ই অক্টোবর তা কার্যকরী করেন। শ্রাবণ মাসে হিন্দু ভাইবোনদের মধ্যে রাখি পরিয়ে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ জাগিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আটকে যায় বঙ্গ বিভাজন। সেই ধারা আজও প্রবহমান বাঙালীর রক্ত ,মাংস ,অস্থি, মজ্জায়। এমন ছোট ছোট অনেক লৌকিক অলৌকিক ও বাস্ত্তব ঘটনা পৌরানিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক ঘটনা রাাখি বন্ধনের  পেছনে।এই দিনটির অপেক্ষা করে থাকে সারা বৎসর ধরে।এই বন্ধনকে এক শ্রেণীর মানুষ অপব‍্যবহার  করছে না তা নয়; সে ব‍্যতিক্রম ও রয়েছে। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মত এ পার্বর্ণে আবাল বৃদ্ধ বনিতা করোনা আবহেও সোস‍্যাল মিডিয়া ও ডিজিট‍্যাল ব‍্যবস্থাকে ভরকরে প্রবাসী এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে নিজ নিকেতনে ভাই বোন আনন্দে বিভোর। পুরানে, ইতিহাসে ও বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এই উৎসব ভায়ের হাতে বোনেদের  বিপদ তারিনীর মঙ্গল সূত্র  বাঁধার  উৎসব। ভাই ও বোনেদের একতার উৎসব।

    আপনাদের শুভকামনায়:- “এগরা প্রেসক্লাব” “এগরা মহাকুমা বইমেলা “, সংবাদপত্র “জনতার কথা” ও “দৈনিক আবেশভূমি”,র পক্ষে সম্পাদক- গৌরীশংকর মহাপাত্র।।           

    তথ্যসূত্র: ১) উইকিপিডিয়া ২)এই সময়

     

    Share

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *