গৌরীশংকর মহাপাত্র: এগরা কাঁথি : পূর্ব মেদিনীপুর।।                                                ।২৩শে আগষ্ট রবিবার সন্ধ্যা ৭.৫৫ মিনিটে বার্ধক্যজনিত কারণে পটাশপুর-২এর আড়গোয়ালে নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষিয়ান সমবায়ী রাজনীতিক ও সংগীত সাধক বিমলকৃষ্ণ নন্দী (৮৯ )। তিনি আড়গোয়াল ইউনিয়নবোর্ডের দীর্ঘ সময়ের শেষ প্রেসিডেন্ট, ৭৮ এর নতুন পঞ্চায়েত থেকে আড়গোয়াল  পঞ্চায়েতে ২০০৩ সাল পর্যন্ত নির্বাচিত পঞ্চায়েত সদস্য। তিনি ২০০৮-২০১৩ পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের কৃষি সেচ ও সমবায় কর্মাধ‍্যক্ষ। কর্মাধ্যক্ষ থাকাকালীন শেষের দিকে এক পথদুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হলে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে বাড়িতে থাকতেন। বড় ছেলে সমাজসেবী পঙ্কজ নন্দীর অকাল প্রয়ানে শোকাহত বিমলবাবু বিছানা নেন।

    বর্ণময় কর্মজীবনে  বহুধা প্রতিভার অধিকারী এই সংগঠক সমসপুর বিষ্ণুপ্রিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং শিক্ষক হিসেবে অবসর’নেন। জব্দা বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠ পরিচালন কমিটি, প্রতাপদীঘি মার্কেটিং সোসাইটি, প্রতাপদীঘি রাইসমিল, আড়গোয়াল সেবক সংঘ, আড়গোয়াল পল্লীশ্রী এস কে ইউ এস, আড়গোয়াল বাজার ব্যবসায়ী সমিতি,পটাশপুর-২পেনসনার্স এ্যাশোসিয়েশন, অবসর, প্রভৃতি বহু সংস্থায় যুক্ত থেকে কখনো সভাপতি ও সম্পাদকের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন। যৌবনে জব্দা “খেয়ালীনাট্য সংস্থা”য় কল্যাণ কুমার মাইতি, দুর্গেশ রথ, বৃন্দাবন নন্দ গোস্বামী, খোকা ভট্টাচার্য্য, পরমেশ্বর শী প্রমুখ’দের সঙ্গে সৌখিন অভিনয়ে ছিলেন জনপ্রিয়।এলাকার এই বেহালা বাদক ও বেহালা শিক্ষক গ্ৰাম বাংলায় সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে প্রয়াত প্রধান শিক্ষক পৃথ্বীশ চন্দ্র দাস, অভয় চরণ দাস, হরেকৃষ্ণ সাহু, রামজীবন মিশ্র, ফনিভূষণ বেরা, ডঃ নৃপেন্দ্রনাথ জানা,সাহিত্যিক মৃত্যুঞ্জয় মাইতি এবং আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক মন্মত নাথ দাস, অধ্যাপক রঞ্জিত নায়ক, ধরণীধর গায়েন,ড:হরিপদ মাইতি, বিনোদবিহারী জানা প্রমুখ’দের নিয়ে “মালঞ্চ” সাহিত্য গোষ্টিতে মংরাজের “তপোতন” এ বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল রুটিন মাফিক। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেলেন স্ত্রী, সঙ্গীত শিল্পীও সমাজসেবী পীযুষ নন্দীসহ দুইপুত্র, তিন পুত্রবধূ,, দুই কন্যা জামাতা, শিল্পী অভিষেক নন্দীর’মত নাতি নাতনী’সহ অসংখ্য গুণমুগ্ধ। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। কাতারে কাতারে মানুষ তার বাড়িতে গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান এলাকায় সমবায় আন্দোলনের এই সহযোদ্ধা’কে। স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রসন্নকুমার ত্রিপাঠীর খুব আস্থাভাজন এই সমাজসেবী ললাট জনকা রাস্তা নির্মাণ ও বারচৌকা জল নিকাশি সংস্কার আন্দোলনসহ বহু জনহিতকর কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁঁর মৃত্যুতে বর্ষীয়ান তৃণমূল সাংসদ শিশির অধিকারী জানান “বিমল বাবু ছিলেন দক্ষ সংগঠক ও ভালো মনের মানুষ, দীর্ঘ  জীবনে  আমাদের সুসম্পর্ক ছিল । বাম শাসন মুক্তিতে তার ভূমিকা ছিল এলাকায় প্রশংসনীয়।  তাঁর প্রয়াণে আমি শোকাহত, তার মৃত্যুতে  আমরা একজন ভালো সংগঠককে হারাল। তাঁর আত্মার সদগতি কামনা করি, শোক বিহল পরিবারকে সমবেদনা জানাই। ”  রাজ্যের  পরিবহন  সেচ ও  সমবায় মন্ত্রী  তথা  কার্ড ব্যাংকের  চেয়ারম্যান  শুভেন্দু অধিকারী  তার  শোকবার্তায়  জানান – ‘”আমরা এক  সমবায় ব্যক্তিত্বকে হারালাম, শ্রদ্ধেয় বিমলকৃষ্ণ নন্দীর প্রয়ান   রাজনীতি ,সাংস্কৃতিক  ও সমবায় ক্ষেত্রে  এক অপূরণীয় ক্ষতি ।”আড়গোয়াল পঞ্চায়েতের উপপ্রধান অপরেশ সাঁতরা জানান -” আমরাএকজন ভালো সংগঠক ও সুপরামর্শদাতা কে হারালাম।” আড়গোয়াল পল্লীশ্রী এস কে ইউ এস এর সম্পাদক রৈবৎ আচার্য জানান-” সমিতির প্রতিষ্ঠা থেকে তিনি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন ,শেষ দিন পর্যন্ত উপদেষ্টামন্ডলী থেকে পরামর্শ দিয়েছেন। আমাদের সমিতি তার এক অভিভাবক কে হারাল। তাঁর প্রয়াণে আমরা শোকাহত, পরিবার পরিজনদের সমবেদনা জানাই।”তার মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে এক সময়ের পঞ্চায়েত সমিতির বিরোধী দলনেতা তথা নেগুয়া সুন্দর নারায়ন হাই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক শিব শংকর মহাপাত্র জানান -” বিমল বাবু ছিলেন এলাকার রাজনৈতিক অভিভাবক, আমি পঞ্চায়েত সমিতির টানা ১৫ বছর বিরোধী দলনেতা  থাকা কালে বরাবরই তার সুপরামর্শ পেয়েছি । ব্লক কংগ্রেসের সভায় তার পরামর্শ বরাবরই গুরুত্ব পেয়েছে । তাঁঁর মৃত্যুতে আমি শোকাহত। পরিবারের প্রতি রইল আমার সমবেদনা।এগরা মহাকুমা তৃণমূল সমবায় ছেলের চেয়ারম্যান গোলাকেশ নন্দ গোস্বামী জানান – “প্রতাপদীঘি রাইস মিল, প্রতাপদীঘি মার্কেটিং সোসাইটিতে তাঁঁর ইতিবাচক ভূমিকা আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর প্রয়াণে এলাকা এক বিশিষ্ট সমবায়ী’কে হারাল। আমি শোকাহত পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জানাই ।”আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক সাহিত্যিক মন্মথ নাথ দাস তার শোক বার্তায় জানান- “শ্রদ্ধেয় বিমলকৃষ্ণ (১৯০৩-২০২০) নন্দীর মহাপ্রয়াণে তার পরিজনদের সঙ্গে আমিও শোকোস্তব্ধ ।আড়গোয়াল গ্রামের সন্তান হলেও জেলার বৃহৎ জনপদের সম্মানিত মানুষ তিনি ।জেলা পরিষদের  সদস্য রূপে কৃষি সেচ ও সমবায় কর্মাধ্যক্ষের দায়িত্ব  দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন তিনি, কিন্তু রাজনীতি তার একমাত্র ক্ষেত্র নয় ।তিনি একজন বিশিষ্ট সমবায় সংগঠক ও সংস্কৃতি পুরুষ ।একাধিক প্রথম সারির সমবায় প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টার  বা সভাপতি তিনি ।সাংস্কৃতিক সংস্থা “মিলনী”র তিনি অন্যতম স্থপতি ও সম্পাদক ।কৃতি বেহালা বাদক ও অভিনেতা।  জব্দা বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠের দীর্ঘ দিনের সম্পাদক এবং বিদ্যাপীঠ প্রাক্তনী সমিতির সভাপতি। সর্বোপরি সদালাপী ও সজ্জন, তাঁঁর প্রয়াণ জনপদে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করলো ।তাঁঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তাঁঁর বিদেহী আত্মার পরম শান্তি ।সেইসঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবার বর্গ’কে জানাই আন্তরিক সমবেদনা ।প্রার্থনা করি ঈশ্বর তাদের এই দুঃখ বহনের শক্তি দান করুন।”

    Share

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *