গৌরীশঙ্কর  মহাপাত্রঃ প্রতিবেদনঃকবি মুকুন্দ দাসের প্রয়াণ দিবস।১৯৩৪এর আজকের দিনে কোলকাতায় তার তিরোভাব। ১৮৭৮ এর ২২ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিক্রমপুর পরগণার বানরী গ্রামে এক অভাবী দে পরিবারে তার জন্ম, বাবা গুরু দয়াল মা শ‍্যামা সুন্দরী। পিতৃদত্ত নাম যজ্ঞেশ্বর দে সবাই আদরে ডাকত যগা বলে। পড়াশুনা বরিশাল জেলা স্কুলে পরে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ। কিশোর বয়স থেকেই মুদি দোকানে বসে নজরদারি। বাল্যকাল থেকেই স্বাধীনচেতা মুকুন্দের গলাটা ছিল ভারি মিষ্টি । বছর ১৯এর ‘যগা’ বীরেশ্বর গুপ্তের কীর্তন দলে যোগ দেন।১৯০২ হরিবোলা নন্দ নামে এক বৈষ্ণব এর কাছে মতান্তরে বরিশালের বৈষ্ণব সন্ন্যাসী রামানন্দ অবধূতের কাছে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা গ্ৰহন।দীক্ষান্তরে তার নাম মুকুন্দ দাস । অশ্বিনী কুমার দত্তের সংস্পর্শে এসে স্বদেশমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হওয়া ও তারই প্রেরণায় মুকুন্দ দাস হয়ে ওঠেন বাংলার চারণ কবি। নিজেই পালাগান রচনা করে সুর দেওয়া ছিল স্বভাবসিদ্ধ । অশ্বিকুমারের নিকট স্বদেশ মন্ত্রে দীক্ষিতের পরে মুকুন্দ দাস গ্রামে গ্রামে দেশাত্মবোধক গান ও স্বদেশী যাত্রাভিনয় করে বেড়াতেন।তার এই কর্মকান্ডে বরিশালে ইংরেজ সরকারের কোপ দৃষ্টি পড়ে।”ছিল ধান গোলা ভরা,শ্বেত ইঁদুরে করল সারা’,এই গানের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ড হয়। কারাগারে থাকা কালে স্ত্রী সুভাষিণীর মৃত্যু। ১৯১৬তে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আহবানে যাত্রা নিয়ে কলকাতা পাড়ি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট হলে মঞ্চায়ন। ১৯২৪এ ৭দিনের চারণ গান শিলিগুড়িতে। রোজ ৫১ টাকা পারিশ্রমিক, কেবল ৭টাকা রেখে ৩৫০ টাক কালি মন্দিরের জন্য সঞ্চয়। সঞ্চিত টাকায় ১৯২৬এ কালিমন্দির প্রতিষ্ঠা। বর্তমান ওই স্থান কেবল ১৯ ডেসমিল সীমাবদ্ধ, চারপাশ ঘিরে ছাত্রাবাস, লাইব্রেরী, দাতব্য চিকিৎসালয় ও পূজা মন্দির।

এই লোক শিক্ষক লোক শিক্ষার বাহন গান ও যাত্রা পালা দিয়ে মানুষ কে দেশাত্ব বোধে উদ্বুদ্ধ করতে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম যাত্রা পালাগান মাতৃপূজা। তার কাছে বৈষ্ণব ও শাক্তের ভেদাভেদ যেমন ছিল না তেমনি মন্দির-মসজিদের পার্থক্য কখনো করতেন না। বাংলার জনগণে তার শ্রদ্ধার আসন ছিল চারণ কবি বলে।
‘ব্রহ্মচারিণী,’ ‘সাধন সঙ্গীত’, ‘পল্লী সেবা,’ ‘কর্মক্ষেত্র,’ ‘সমাজ,’ ‘সাথী,’ ‘পণ’ প্রভৃতি রচনা সম্ভারে তাঁর সৃষ্টি শৈলী সবার নজর কাড়ে। “ভেঙ্গে ফেল কাঁচের চুড়ি বঙ্গনারী আর কভু হাতে পরো না/ তোমরা যে গৃহলক্ষী ধর্ম স্বাক্ষী জগৎ জুড়ে আছে জানা।” প্রবাদ আছে অসহযোগ আন্দোলনের সভামঞ্চে এই গান যখন গাওয়া হচ্ছে তখন ক্ষুব্ধ স্বদেশী নারীদের হাতের কাঁচের চুড়ি ভাঙ্গার শব্দ গানের সুর কে ছাপিয়ে গেছে, প্রতিবাদে মুখর হতে এক উন্মাদনা জুগিয়েছে।এর গানের কলি সুর ও কন্ঠস্বর আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

একসময় বাংলার গ্রামে গ্রামে তার অনুগামীদের উন্মাদনা কান পাতলে আজ সে গান শোনা যায়‌। সারা জীবনে প্রায় ৭০০ মেডেল ও বহু পুরস্কার পেয়েছেন কিন্তু তার শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি ‘চারণ কবি’ যা এখনো এক ডাকে তাকে চিনতে সাহায্য করে। কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ বাংলা মায়ের এই দামাল ছেলেকে চারণ সম্রাট মুকুন্দ উপাধিতে ভূষিত করেন। সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টা যেমন বেঁচে থাকে চিরকাল। ‘বল শ্যামা সঙ্গিনী যোগিনী সঙ্গিনী’, ‘পাঠিয়ে দে মা আনন্দময়ী’,’ ‘বিশ্ব প্রসবিনী ত্রিলোক পালিনী,’ কিংবা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি, হাসি হাসি করব ফাঁসি দেখবে জগৎবাসী,’ তিনি আজ নেই কিন্তু তার এই গান ও সুর আজও বাঙালীর আবাল বৃদ্ধ বনিতার যেন প্রেরণা সঙ্গীত। যেন হিন্দুর রমণীর তুলসী তলার প্রদীপ কিংবা মৃত্যু শিয়রে রামায়ণ গ্রন্থের মত প্রেরণা শক্তি।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *